ওং কার-ওয়াই পরিচালিত হংকং সিনেমাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম আলোচিত সিনেমা হচ্ছে Ashes of Time। ১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই হংকং সিনেমা সম্বন্ধে ভক্তদের কাছ থেকে বেশিরভাগই মিশ্র প্রতিক্রিয়া শোনা যায়, তবে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াই বেশি শোনা যায়। অনেক খাঁটি ওং কার-ওয়াই ভক্তও এই সিনেমাকে "বোরিং" বলতে বাধ্য হয়েছেন।
আমি প্রায়ই এই সিনেমার ব্যাপারে হংকং সিনেপ্রেমীদের অভিমত জানতে চাই, যার ফলাফল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় নেতিবাচক অভিমত।
আমার মতে Ashes of Time is a timeless masterpiece। বেশিভাগ দর্শকের মূল ভুলটা হয় "প্রত্যাশায়"। সকলে এটার থেকেও অন্যান্য ওং কার-ওয়াই সিনেমার মত স্টাইলিশ কিছু আশা করে থাকেন, কিন্তু আসলে এটা তেমন নয়। এটা উশিয়া সিনেমা হিসেবে পরিচিত হলেও, উশিয়া ফ্যানদেরও এটা সন্তুষ্ট করতে পারেনি, মুভির ধীরগতি এবং প্রথাগত উশিয়া সনা হওয়ার ফলে। অর্থাৎ ওং কার-ওয়াই এবং উশিয়া, দুই ফ্যানবেজের কাওকেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি এই সিনেমা কারণ এটা এই দুই ক্যাটাগরির খানিকটা মাঝামাঝির সিনেমা। উশিয়া সিনেমায় হিরোইজম অনেক বড় অংশ হলেও এই মুভিতে হিরোইজম দেখানো হয়নি, এই মুভিতে দেখানো হয়েছে "হিরোদের অনুভূতি"।
এই সিনেমাটা ঠিক মানসিকতায় দেখাটা ভীষণ জরুরি। এই সিনেমা থেকে কিছু নেয়ার চেষ্টা করবেন না, এই সিনেমা সবকিছু নিজ থেকেই আপনাকে দিবে। আপনার শুধু মনযোগ দিয়ে মুভিটি দেখতে হবে। প্রতিটি কথ বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
মুভিতে গল্পের তেমন একটা জোর নেই, আপনাকে প্রতিটি চরিত্রের চারিত্র্য বুঝতে হবে। একবার এটা বুঝে গেলে বাকি গল্প আপনা-আপনিই বের হতে থাকবে। তবে খালি চোখে গল্পের জোর কম থাকলেও আমার মতে ওং কার-ওয়াইর সিনেমাগুলোর মাঝে এটার গল্প সবচেয়ে জটিল।
মুভি শুরু আউয়াং ফেংকে দিয়ে। তাঁর কাছে একজন মদ পানীয় নিয়ে আসে। এই মদ পানীয়র বিশেষত্ব হচ্ছে, এটা পান করলে জীবনের যে অংশ আপনি ভুলে যেতে চান, সেটা সহজেই ভুলে যেতে পারবেন।
ওহ, আউয়াং ফেংয়ের বিষয়ে তো বলা হলো না। লেজলি চিউং অভিনীত এই চরিত্রটা হচ্ছে একজন তরবারি যোদ্ধা এবং সাহায্যকারীর চরিত্র। সে টাকার বিনিময়ে মানুষের বিভিন্ন কাজ করে দেয়। পুরো মুভি জুড়ে বিভিন্ন মানুষ তাঁর কাছে সাহায্যের জন্য আসে, মূলত এগুলো নিয়েই মুভির গল্প নির্মিত। অর্থাৎ পুরো গল্প আউয়াং ফেংকে ঘিরে বানানো৷
যেমনটা উপরে বলেছি, মুভিটা খানিকটা ধীরগতির। ওং কার-ওয়াইর অন্যান্য সিনেমাগুলোর তুলনায় এটা কিছুটা ধীরগতির তবে আমার মতে এই ধীরগতিটা চরিত্রগুলো বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, নাহলে গল্পের জটিলতা টা ধরা যেতো না।
বাকি ওং কার-ওয়াইর সিনেমার পরিচালনা, সিনেমাটোগ্রাফি, অভিনয়, মিউজিক ইত্যাদি ইত্যাদি এগুলো কেমন তা আমি আর নতুন করে বলবো না। আমরা কমবেশি সবাই জানি যে ওং কার-ওয়াইর সিনেমা এগুলোর কারণেই বিখ্যাত। তাই পরিচালনা, সিনেমাটোগ্রাফি ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয় কেমন হয়েছে, তা নিয়ে আর আলাদা কিছু লিখবো না৷
এই সিনেমার আরেকটি এসেনশিয়াল পার্ট হচ্ছে এর তারকা কাস্ট। মুভিতে অভিনয় করেছেন:
- লেজলি চিউং
১ বার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরুষ্কার জয়ী লেজলি চিউং যাকে ১ বারের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা অথবা কান চলচিত্র উৎসবে পাওয়া নমিনেশন দিয়ে মাপা যায় না, কারণ তিনি তাঁর সময়ে ছিলেন অনন্য একজন অভিনেতা।
- টনি লিউং চিউ-ওয়াই
হংকংয়ে সর্বোচ্চ ৫ বার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরুষ্কারের পাশাপাশি কান চলচিত্র উৎসবেও জিতেছেন ১ বার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরুষ্কার এবং ৩ বার গোল্ডেন হর্স।
- ম্যাগি চিউং
হংকংয়ে সর্বোচ্চ ৫ বার, তাইওয়ানে সর্বোচ্চ ৪ বার সহ কান চলচিত্র উৎসবে জিতেছেন ১ বার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরষ্কার।
- টনি লিউং কা-ফাই
টনি লিউং চিউ-ওয়াইর পর তিনিই হংকংয়ে সর্বোচ্চ ৪ বার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরষ্কার জিতেছেন।
এছাড়া জ্যাকি চিউং, ব্রিজিটি লিন, চার্লি ইয়াংয়ের মত সকল শীর্ষ পর্যায়ের অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে বানানো হয়েছে এই সিনেমা। ক্যামেরার পেছনে ছিলেন সবার প্রিয় ওং কার-ওয়াই৷ সিনেমাটোগ্রাফির দায়িত্বে ছিলেন প্রখ্যাত ক্রিস্টোফার ডয়েল আর মিউজিকের দায়িত্বে ছিলেন আমার খুব প্রিয় কম্পোজার ফ্র্যাংকি চ্যান। অ্যাকশন কোরিওগ্রাফির টুকটাক কাজ সেরেছেন আমার নজরে পৃথিবীর অন্যতম সেরা কোরিওগ্রাফার সাম্মো হাং, অর্থাৎ সকল বিজ্ঞ মহারথীদের হাতে নির্মিত হয়েছে এই সিনেমা। এমন সিনেমা না দেখে উপায় আছে?
![]() |
| বাম থেকে: জ্যাকি চিউং, ব্রিজিটি লিন, লেজলি চিউং, কারিনা লাউ, টনি লিউং কা-ফাই, ম্যাগি চিউং, জো ওয়াং এবং টনি লিউং চিউ-ওয়াই। |




