প্রিয়, লেজলি চিউং

লেজলি চিউং এর জন্ম হংকং এর কাওলুন শহরে ১৯৫৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বরে। হংকং শহরে জন্ম হলেও বেড়ে উঠেছেন ইংল্যান্ডে। ইন্ডাস্ট্রিতে সে অনেক স্ট্রাগল করেছেন, সিঙ্গার হিসেবে ৮০ দশকের শুরুর দিকেই জনপ্রিয়তা পান লেজলি চিউং, সেই সময় ক্যান্টোপপ তারকা হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়া চাট্টিখানি কথা ছিল না। ইন্দোনেশিয়া, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, জাপান সহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ক্যান্টোপপ সে সময় তুমুল জনপ্রিয় ছিল। সিঙ্গার হিসেবে সফলতা পেলেও অভিনেতা হিসেবে স্ট্রাগল অব্যহত ছিল।
লেজলি চিউংয়ের অভিনয় শুরু হয় ক্যাটাগরি থ্রী ক্লাসিফাইয়েড মুভি দিয়ে, যদিও সেসময় অফিশিয়ালি ক্যাট থ্রী সিনেমা ছিল না। এটা ক্যাট থ্রী'র রেটিং পায় (ক্যাট থ্রী মানে আডাল্ট সিনেমা)। তারপর একের পর এক লো বাজেট, নিম্ন মানের সিনেমাতে অভিনয় চালিয়ে যান। তাঁর ক্যারিয়ারে অভিনেতা হিসেবে অবশেষে সে জনপ্রিয়তা পায় A Better Tomorrow (1986) দিয়ে, তবে এই জনপ্রিয়তার সিংহভাগ কৃতিত্ব মুভির অন্য দুই অভিনেতা চাও ইউন ফাট এবং টি লুংয়ের। এই মুভিটা হংকং এর সেই সময়ের সকল বক্স-অফিস রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের গ্যাংস্টার মুভিতে ছাপ রেখে যায় এই মুভি। এই মুভি দিয়েই হংকংয়ে গ্যাংস্টার সিনেমার জনপ্রিয়তা পাওয়া শুরু করে। এই মুভিতে গাওয়া লেজলির থিম গান "In the Sentimental Past" যে কারো মনে নাড়া দিবে। তবে মুভিতে লেজলির অভিনয় আমাকে মুগ্ধ করেনি, মুভিটা যে মাপের ছিল সে মাপের অভিনয় সে করতে পারেনি। মুভির অন্য ২ তারকা আর পরিচালক জন ইউর বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সে অভিনেতা হিসেবে ব্রেকথ্রু পেয়েছে। কিন্তু পরের বছরেই হংকং দেখতে পায় অন্যরকম এক লেজলি চিউং কে। এই লেজলির যেন জন্মই এই ইন্ডাস্ট্রিতে রাজত্ব করার জন্য। A Better Tomorrow মুভির প্রযোজক সাই হার্কের খুবই ভালো লেগেছিল লেজলি চিউংকে। সে পরের বছর আরো ২ টি মুভি প্রোডিউস করে লেজলি চিউংকে নিয়ে। একটি A Chinese Ghost Story (1987) যা এই জনরার সেরা হংকং ফিল্ম, আমার ব্যক্তিগত সবচেয়ে পছন্দের রোম্যান্টিক ফিল্ম, এবং অপরটি A Better Tomorrow II (1987) ২ টি মুভিতেই লেজলির অভিনয় অসাধারন ছিল।
এক বছরের মাথায় সে অনেক পরিণত অভিনয় আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন। ১৯৮৭ সালেই লেজলির মিউজিক অ্যালবাম Summer Romance 87′ মুক্তি পায় যা ঐ বছরের বেস্ট সেলিং অ্যালবাম ছিল হংকং’এ। এবং এই অ্যালবামের গান RTHK Top 10 Gold Songs এও জায়গা পায় । আবারো বলছি, ঐ সময় ক্যান্টোপপ জগতে কম্পিটিশন ছিল প্রচুর, এইসব অর্জন চাট্টিখানি কথা নয়। ১৯৮৭ সালের টার্নিং পয়েন্টের পর লেজলি চিউংকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি,তবে সমস্যা বেঁধেছিল অন্য জায়গায়। এইসব ফেম, পপুলারিটি থেকে দূরে সরে গিয়ে মাঝের একবছর কানাডায় শিফট হয়েছিলেন লেজলি চিউং। হংকং এর বিভিন্ন পরিচালক, প্রযোজকরা তাকে চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ জানায় তাকে হংকং’এ ফিরে আসার জন্য, সবাই তাকে বলে “হংকং ইন্ডাস্ট্রির তোমাকে খুব প্রয়োজন” । এতো মানুষের অনুরোধ না রেখে পারা যায়? হংকং’এ ফিরে আসে লেজলি চিউং, তবে এবার অন্য রুপে এবং অভিনয়ের ভাণ্ডার আরো সমৃদ্ধ করে। মিউজিক ক্যারিয়ার থেকে অবসর নিয়ে নেন ১৯৮৯ সালে। কারণ ছিল পুরো মনযোগ দিবেন অভিনয়ে। অভিনয়ে মনযোগ দেয়াটা যে ফলপ্রসূ ছিল, তার প্রমাণ পেতে সময় লেগেছিল মাত্র ১ বছর। ১৯৯০ সালেই ওং কার-ওয়াই পরিচালিত Days of Being Wild (1990) মুভিতে অভিনয় করে সে দেখাতে সক্ষম হন যে অভিনেতা হিসেবে এখন কতোটা পরিপক্ব লেজলি চিউং৷
তাঁর সুদর্শনের বিষয়টাও এড়িয়ে যাওয়া যায় না, CNN লেজলি চিউং কে "হংকংয়ের সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ" হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল । বিভিন্ন পরিচালকরাও তাঁর সুদর্শন কে সুন্দর ভাবে ব্যবহার করেছেন, তবে লেজলি শুধুমাত্র তাঁর বাহ্যিক সৌন্দর্যে নয়, সে তার মেধায় ও সমান মনযোগী ছিলেন।
লেজলির যে বিষয়টা আকর্ষনীয় সেটা হচ্ছে তাঁর ক্যারিয়ারের শুরু এবং মাঝ পথ। ৮০ দশকের লেজলি এবং ৯০ দশকের লেজলিকে কখনই মেলানো সম্ভব নয়। সে শৈল্পিক গুণ কে অনেক শ্রদ্ধা করতেন, এবং ভালো-মন্দ বিচারের গুণটা তাঁঁর দারুণ ছিল। সে শুরু করে একজন পপ আইডল হিসেবে, উত্তেজনায় টালমাটাল সব গান দিয়ে। কিন্তু অবসরের পর ১৯৯৫ সালে ফিরে আসে Most Beloved (1995) অ্যালবাম দিয়ে। এবার ভক্তরা দেখতে পায় ভিন্ন এক শিল্পী লেজলিকে। তাঁর গানের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যায়। আগে তার গান শুনতে ভালো লাগতো, কিন্তু অবসর থেকে ফেরার পরের গানগুলো শুধু ভাল লাগাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, সেগুলো সবার আবেগে পরিণত হয়। সে মিউজিক কম্পোজ করা শুরু করে ৯৫’ এর পর থেকে। এবার আসা যাক ফিল্ম স্টার লেজলির দিকে। অভিনয় দিয়ে তো ইন্ডাস্ট্রিতে অবদান রেখেছেনই, তবে পরে তাঁর ইচ্ছে ছিল পরিচালক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করবেন। পরিচালক হিসেবে হয়তো ডেব্যু হয়েই যেতো যদি না তাঁর বন্ধু ওং কার-ওয়াই তাকে নিষেধ করতেন। ওং কার-ওয়াই অবশ্য তাকে নিষেধ করেননি, বরং পরামর্শ দিয়েছিলেন, বলেছিলেন “তুমি এখনো অনেক ইয়াং, অভিনয় টা চালিয়ে যাও। পরিচালনা তো ৬০-৭০ বছর বয়সেও করতে পারবে।” লেজলিও এই পরামর্শ গ্রহণ করে অভিনয় চালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, ওং কার-ওয়াই কি জানতেন যে এইরকম প্রতিভাবন, ইউনিক, মেধাবী একজন তারকা মাত্র ৪৬ বছর বয়সে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করবে, তাও আবার আত্মহত্যা করে? বিষণ্ণতায় ভুগে ১ এপ্রিল,২০০৩ সালে ম্যান্দারিন ওরিয়েন্টাল হোটেলের ২৩তলা থেলে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন লেজলি চিউং। আত্মহত্যা কেন করেছেন তা নিয়ে একেক জনের একেক মত, তবে আমার কাছে কারণ টা মূখ্য বিষয় নয়। তাঁর মত একজন তারকাকে অকালে হারিয়েছি সেটাই আফসোস এবং কষ্ট। লেজলির যে বিষয় টা আমার সবচেয়ে ভালো লাগে, সে চরিত্রের অনুযায়ী তার শারীরিক ভাষা, কণ্ঠ ইত্যাদি ইত্যাদি সব কিছুতেই পরিবর্তন করতে পারতেন। সে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করলে মনে হয় এই ২ টা চরিত্র ভিন্ন ২ জন ব্যক্তি করেছেন। সে চরিত্রের গভীরে পৌছে যেতেন। তাঁর আরেকটা গুণ হচ্ছে তাকে খুবই এফর্টলেস দেখাতো, মনে হতো এই চরিত্রের জন্য সে কোন পরিশ্রম করেননি, সে নিজেই এই চরিত্র। এই বিষয় লেজলি একবার বলেছিলেন, "আমি যখন চেন ডিয়াইর মেকআপ করতাম তখন আর আমি লেজলি চিউং থাকতাম না, আমি চেন ডিয়াই হয়ে যেতাম”।
লেজলি চিউং এর মুভি সিলেকশনের ক্রাইটেরিয়াও অন্যান্য হংকং অভিনেতাদের থেকে আলাদা ছিল। তাঁর কাছে স্টোরি, কো স্টার এগুলো কোন বিষয় ছিল না, তাঁর যদি অনুভব হতো এই পরিচালকের পক্ষে এই মুভিতে কোন কিছু একটা করা সম্ভব তাহলে সে ঐ মুভিতে অভিনয় করতেন। লেজলি চিউং হংকং ফিল্ম অ্যাওর্ডাসে মাত্র ১ বার সেরা অভিনেতার পুরষ্কার জিতেছেন Days of Being Wild (1990) মুভির জন্য, তবে মাত্র ১ টা সেরা অভিনেতার পুরষ্কার তার অভিনয় গুণ কে জাস্টিফাই করে না। লেজলি চিউং এর অর্জনের খাতাটা অবশ্য অনেক ভারি। CNN এর ২০১০ সালের এক পোলে বিশ্বের ৩য় সেরা আইকনিক পপ তারকা নির্বাচিত হয়েছিলেন লেজলি চিউং, হ্যাঁ পুরো বিশ্বের, শুধু এশিয়ার নয়। CNN এর মতে লেজলি চিউং সর্বকালের সেরা ২৫ জন এশিয়ান অভিনেতার একজন। চীনের শত বছরের সেরা এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন লেজলি চিউং। তাঁর ১৯৮৪ সালের হিট গান " Monica " গত শতাব্দীর সেরা ক্যান্টোনিজ গান নির্বাচিত হয়েছে। CCTV-MTV Music Honours ২০০০ সালে তাকে এশিয়ার সবচেয়ে বড় তারকা ঘোষণা করেছিল। সে ১৬ টি কনসার্ট করেছে জাপানে, কোন ক্যান্টোপপ তারকা এখনো এতো কনসার্ট জাপানে করতে পারেনি। কোরিয়াতে ক্যান্টোপপ সিঙ্গারদের মধ্যে তার গান সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে।

Dishan

Just sharing my thoughts and feelings or things I watch. Nothing else.

Previous Post Next Post

যোগাযোগ ফর্ম