A Better Tomorrow (1986) হংকং ইতিহাসের অন্যতম ইনফ্লুয়েনশিয়াল মুভি

১৯৮৬ সালের কাল্ট ক্লাসিক গ্যাংস্টার মুভি, যার হাত ধরে হংকংয়ে শুরু হয় অ্যান্টি হিরোর জনপ্রিয়তা।
মুভিতে অভিনয় করেছেন চাও ইউন-ফাট, লেজলি চিউং এবং টি লুং আর এই মুভি পরিচালনা করেছেন জন ইউ। 
এই মুভি আমি যখন দেখি, সেসময় বাচ্চা ছিলাম, গ্যাংস্টার মুভি পছন্দ করতাম না। এটা মোটামুটি ভালো লেগেছিল, তাই ভেবেছিলাম এটা লেখার মত কোন মুভি নয়। কিন্তু পরে আসতে আসতে উপলব্ধি করা শুরু করি যে এই সিনেমা হংকং ফিল্ম জগতে কতটা ইনফ্লুয়েন্স রেখেছিল। 



এবার আসি মূল আলাপে। ১৯৮৬ সালের ঘটনা, একজন লো-প্রোফাইল ডিরেক্টর জন ইউ সিদ্ধান্ত নিলেন একটি সিনেমা বানাবেন, অন্যদিকে মুভিটি প্রোডিউস করবেন সাই হার্ক। (আগেই বলে রাখি: বর্তমানে এই জন ইউ এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ৫-১০ টা পরিচালকের একজন হলেও সেসময় হংকংয়ে তাঁর নামডাক সেরকম ছিল না। মোটামুটি কয়েকটি ভালো মুভি বানিয়েছিলেন, তবে সেগুলো ততোটা জনপ্রিয় ছিল না।)
সাই হার্ক মুভিতে কাস্ট হিসেবে নিলেন টিভি সিরিজে কাজ করে সামান্য খ্যাতি পাওয়া চাও ইউন ফাট (Chow Yun-fat), মুভি জগতে স্ট্রাগল করা পপ আইডল লেজলি চিউং (Leslie Cheung) এবং, এক ৭০ দশকের জনপ্রিয় অভিনেতা, যাকে মানুষ ভুলতে চলেছে, টি লুংকে (Ti Lung)।  
কাস্টিং এবং পরিচালক তেমন আকর্ষণীয় না হওয়ায় সেসময় এই সিনেমা নিয়ে হয়ত কারো অতটা মাথাব্যথা ছিল না। 
এটা সেসময়ের অন্যান্য ৮-১০ টা স্ট্যান্ডার্ড অ্যাভারেজ মুভি হওয়ার কথাই ছিল কিন্তু বিপত্তি বাঁধে অন্য জায়গায়। জন ইউ এবং সাই হার্ক মিলে সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরা বানাবেন গ্যাংস্টার মুভি। যেখানে "হিরো" রূপে থাকবেন গ্যাংস্টাররা, যাদের কাছে খুনখারাপি, অর্থপাচার ইত্যাদি ইত্যাদি অপরাধ করা কোন ব্যাপারই না। এমন লোকদের রিপ্রেজেন্ট করা হবে "হিরো" চরিত্রে। 
মনে মনে হয়ত আপনারা ভাবছেন যে, "এটাতে বড় ব্যাপার কী?", তাই না?। এটা ভাবাই স্বাভাবিক, কারণ আপনি নিশ্চয়ই ইতোমধ্যে অনেক গ্যাংস্টার সিনেমা দেখেছেন, তাই এটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে কিন্তু তখন হংকংয়ে এটা ছিল অস্বাভাবিক। 
সেসময় হংকংয়ের সেন্সর সিস্টেমের একটা অদ্ভুত নিয়ম ছিল: কোন ভায়োলেন্ট, রক্তপাত, হত্যাযজ্ঞ ইত্যাদি ইত্যাদি গল্পে মুভি বানাতে হলে মুভির সেটিং থাকতে হবে প্রাচীন আমলের। মানে বোঝাতে হবে যে এই মুভি বহু আগে বানানো, যখন হংকং চীনের অধীনেই ছিল। আধুনিক পোশকের গল্পে কোন রক্তপাত, ভায়োলেন্ট দেখানো যাবে না। কারণ আধুনিক হংকং ছিল ব্রিটিশদের অধীনে। তবে আসতে আসতে হ্যান্ডওভার ঘনিয়ে আসতে শুরু করলে ব্রিটিশরা হংকংয়ের এসব সেন্সর সিস্টেম নিয়ে মাথাব্যথা বন্ধ করে দেয়। যারফলে হংকং সেসময় পুরোপুরি ওপেন এবং লিবারেল ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়। বিধায় কোনধরনের কোন সমস্যা ছাড়াই এ বেটার টুমরো মুভিটি মুক্তি পায়। 

আর মুক্তির পরে যা হলো, তা কী খোদ জন ইউ নিজে আন্দাজ করতে পেরেছিলেন কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। এটা হয়ে যায় সেই সময়ের হাইয়েস্ট-গ্রোসিং হংকং ফিল্ম। 
হংকং এর সকল বক্স-অফিস রেকর্ড ওলটপালট করে দেয় মুভি। মানুষের মুখে মুখে চলতে থাকে এই মুভির চর্চা। এই মুভিতে চাও ইউন-ফাটের পরিহিত ট্রেঞ্চ কোট হয়ে যায় তখনকার "ট্রেন্ড"। আর পপ আইডল লেজলি চিউং এর গাওয়া In the Sentimental Past থীম গানটি হয়ে যায় হংকং এর সবচেয়ে হিট গান। এখন পর্যন্ত ক্যান্টোনিজ ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় গান সম্ভবত এটিই। এই গানের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে আমি একটি কথা প্রায়ই বলি, "এই গান শুনে যে কিছু অনুভব করে না, সে এখনো পুরোপুরি হংকং মুভির ভক্ত হতে পারেনি।
হংকং পেরিয়ে এই সিনেমা বনে যায় পুরো এশিয়ার সেই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমা মুভি। 
 
একবার ভাবেন, এই সিনেমা মুক্তির ২৪ বছর পর, ২০১০ সালে কোরিয়ার এক ভ্যারাইটি শো'তে এই মুভি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়। এমন একটা শো', যেটা পুরোপুরি মুভি সম্বন্ধে তৈরি নয়৷ তার উপর কোরিয়ানদের নিজেদেরই আলোচনা করার মত সিনেমার অভাব নেই, কিন্তু সেই ভ্যারাইটি শো'তে আলোচনা হয় A Better Tomorrow মুভি নিয়ে। 

বলছিলাম সাউথ কোরিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ভ্যারাইটি শো Running Man এর কথা। এছাড়া রানিং ম্যানের বিশেষ মুহূর্তগুলোতে অ্যানথিম হিসেবে এই মুভির থীম গান ব্যবহার করা হয়। জনপ্রিয় কে-ড্রামা Reply 1988 শুরু হয় এই মুভির দ্বিতীয় পার্টের দৃশ্য দিয়ে। 
আরেক জনপ্রিয় কে-ড্রামা My Girlfriend is a Gumiho-তে সাং দোং-ইলের পুরো চরিত্র টাই সাজানো হয় মার্ক গরের ফ্যান হিসেবে। (মার্ক গর হচ্ছে A Better Tomorrow মুভিতে চাও ইউন-ফাটের চরিত্রের নাম) 
একটা মুভি কতটা জনপ্রিয় হলে আজও দেশ-বিদেশে এই মুভির চর্চা হয় ভাবেন? 
Reply 1988 ড্রামার প্রথম এপিসোডের প্রথম দৃশ্য। 



এই সিনেমার পরে জন ইউ বনে যান হংকং এর সবচেয়ে বড় পরিচালকদের একজন। আজ তিনি হংকং পেরিয়ে পুরো বিশ্বের অন্যতম নাম। আমেরিকায় Face Off এর মত সিনেমা পরিচালনা করেছেন। বিখ্যাত ফ্র‍্যাঞ্চাইজি Mission Impossible এরও একটি পার্ট পরিচালনা করেছেন।  
আর হংকংয়ে  Bullet in the Head (1990), The Killer (1989) এবং Hard Boiled (1992) এর মত বিখ্যাত বিখ্যাত গ্যাংস্টার সিনেমা তো বানিয়েছেনই। 

চাও ইউন-ফাট পরিণত হন হংকং এর সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতায়। সেই সময়, ১৯৮৮ সালে, হংকং ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার ৯ নমিনেশনের ৩ টিই একা পান চাও ইউন-ফাট। ৩ টি ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করার জন্য। যে ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসে জ্যাকি চ্যানের মত অভিনেতা শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরষ্কার পাননি, ৯ টি নমিনেশন পাওয়া সত্বেও। লেজলির মত অভিনেতা মাত্র একবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরষ্কার জিতেছেন, সেই ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসে চাও ইউন-ফাট জিতেন ব্যাক-টু-ব্যাক দুইবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরষ্কার। আর কেউ হংকংয়ে পরপর দুইবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরষ্কার জিতেননি। তার উপর আবার ৯ নমিনেশন ৩ টাই তিনি একা পান। তাঁর অবস্থা রাতারাতি কতোটা পাল্টে গেছিল, তা ভাবতে পারছেন? 
২০০০ সালে চাও ইউন-ফাট অভিনয় করেন অ্যাং লির Crouching Tiger, Hidden Dragon মুভিতে, যা ৪ টি ক্যাটাগরিতে অস্কার জিতে। যার মধ্যে একটি ছিল Best Foreign Language Film। 


সেই সময়ে পপ আইডল হিসেবে বিখ্যাত লেজলি চিউং এই সিনেমার মাধ্যমে ক্যারিয়ারে নতুন রাস্তা আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে তিনি অভিনয় করেন A Chinese Ghost Story, Rouge, Days of Being Wild, Farewell My Concubine, Ashes of Time, Happy Together ইত্যাদি ইত্যাদির মত বড় ভড় সিনেমায়। যার মধ্যে অন্যতম চেন কেইজ পরিচালিত Farewell, My Concubine (1992)। এটি চীনা ভাষার একমাত্র সিনেমা, যা কান চলচিত্র উৎসবে Palme D'or জিতেছে। এর আগে অথবা পরে আর কোন চীনা ভাষার সিনেমা এই পুরষ্কার জিততে পারেনি। তাছাড়া সেবছর অস্কারেও নমিনেশন পেয়েছিল এই সিনেমা। এইরকম একটি সিনেমার মূল প্রাণ ছিল লেজলি চিউং এর অসম্ভব সুন্দর অভিনয়। 
যে কেউই মানতে বাধ্য হবেন যে, লেজলি চিউং এশিয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের একজন। 


অন্যদিকে ৭০ দশকের জনপ্রিয় মুখ, টি লুং, যিনি শ ব্রাদার্স স্টুডিও ছাড়ার পর নিজেকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। তিনি এই মুভির মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রিতে দ্বিতীয় জীবন পান। 


এইতো হলো মুভির সাথে জড়িত থাকা মানুষদের এই সিনেমা থেকে পাওয়া সাফল্যের কথা। তবে এই সিনেমা হংকং ইন্ডাস্ট্রিকেও কম সাহায্য করেনি। এই মুভি দিয়েই তৈরি হয় হংকংয়ে গ্যাংস্টার সিনেমা বানানোর ট্রেন্ড। যেখানে পরবর্তীতে হংকং বানায় Infernal Affairs এর মত গ্যাংস্টার ফিল্ম, যা বিশ্লেষণে শুধু মুভির নামটিই যথেষ্ট। যার রিমেক তৈরি করে মার্টিন স্করসিস অস্কার জয়লাভ করেন। Infernal Affairs তো শুধু উদাহরণ। আরো কতশত দুর্দান্ত গ্যাংস্টার সিনেমা তৈরি হয়েছে তারপর। 

এই সিনেমা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শুধু হংকং নয়, হংকং এর বাহিরেও প্রচুর সিনেমা নির্মাণ হয়েছে। 
এশিয়ান জগতের গ্যাংস্টার সিনেমার কথা বললে জাপানের বিখ্যাত ইয়াকুজা কালচার অথবা সাউথ কোরিয়ার  অসাধারণ কিছু গ্যাংস্টার সিনেমার নাম সামনে আসবে কিন্তু ইনফ্লুয়েন্সের বিবেচনায় A Better Tomorrow কে আপনি শীর্ষ ৩ অথবা ৫-য়ে রাখতে পারেন চোখ বন্ধ করে। 
সাউথ কোরিয়ার যে আজকের ওয়েভ চলছে, সেটার অন্যতম সৃষ্টিকারী ছিল ১৯৯৯ সালের সিনেমা Shiri। সেই Shiri সিনেমার অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিল A Better Tomorrow মুভির পরিচালক জন ইউ। 


Dishan

Just sharing my thoughts and feelings or things I watch. Nothing else.

Previous Post Next Post

যোগাযোগ ফর্ম