বর্তমান এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতাদের একজন টনি লিউং। সমৃদ্ধশালী ফিল্মোগ্রাফির অধিকারী টনি লিউং তাঁর অভিনয়, ফিল্ম সিলেকশন এবং ব্যক্তিত্বের জন্য সবার আদর্শ ফিগারে পরিণত হয়েছেন। তাঁর আর্ট এবং ক্রাইম-অ্যাকশন ঘরনার সিনেমাগুলো ভক্তদের মাঝে খুব জনপ্রিয় যেমন; In the Mood for Love (2000), Happy Together (1997), Chungking Express (1994), Lust, Caution (2007), Hard Boiled (1992), Infernal Affairs (2002) ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সিনেমাগুলো নিয়ে প্রতিনিয়ত আলোচনা, চর্চা হচ্ছে৷ তবে এসবের মাঝে আড়ালে থেকে যাচ্ছে তাঁর অভিনীত বেশ কয়েকটি দারুণ দারুণ কমেডি সিনেমা। তাই আজ আমি তাঁর অভিনীত সেরা ১০ টি কমেডি সিনেমা বাছাই করবো।
10.Love Me, Love My Money (2001)
dir: Wong Jing
এই সিনেমায় টনি লিউং একজন ধনীব্যক্তির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। ধনী হলেও সে প্রচণ্ড কৃপণ। তার কৃপণতার একটা উদাহরণ হচ্ছে; সে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। কারণ মোবাইল ফোন থাকা মানেই খরচ। তার যখন প্রয়োজন হয়, তখন সামনে থাকা ব্যক্তির মোবাইল কিছুক্ষণের জন্য ধার নিয়ে ফোন কলের কাজ সারেন। অনেকসময় রাস্তার অপরিচিত লোকের থেকেও সে মোবাইল ধার নেয়।
তার আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, সে নারীদের বিশ্বাস করতে পারে না। একদিন তার দেখা হয় আর্থিক সংকটে থাকা এক মেয়ের সাথে।
খুব ভালো মানের সিনেমা তা বলা যাবে না, তবে টনি লিউং এবং শুকির জন্য একবার দেখাটা খুব কষ্টকর হওয়ার কথা নয়।
9.Seoul Raiders (2005)
dir: Jingle Ma
২০০০ সালের ব্যবসাসফল সিনেমা Tokyo Raiders এর সিকুয়েল। এটার গুণাবলি আলাদা করে বলার মত কিছু নেই। Tokyo Raiders দেখলে এটাও দেখতে ইচ্ছে করবে। Tokyo Raiders সিনেমায় টনি লিউংয়ের সাথে মিলে ত্রয়ী বেঁধেছিলেন একিন চ্যাং এবং কেলি চ্যান। এটাতে ত্রয়ী বেঁধেছেন রিচি জেন এবং শুকি৷ Tokyo Raiders এর ফ্যান হলে এটাও মোটামুটি ভালো লাগবে।
8.Tom, Dick and Hairy (1993)
dir: Lee Chi-ngai, Peter Chan
এই সিনেমায় দুই টনি লিউং (টনি লিউং চিউ-ওয়াই এবং টনি লিউং কা-ফাই) একসাথে অভিনয় করেছেন। তাদের সাথে কেন্দ্রীয় চরিত্রে আরো অভিনয় করেছেন লরেন্স চ্যাং৷
এই তিনজনের পৃথক ভালোবাসা নিয়ে সিনেমার গল্প তৈরি৷ সিনেমায় একদম ব্যতিক্রমী তেমন কিছু নেই৷ সময় পার করার জন্য দেখা যেতে পারে। বোনাস হিসেবে পাবেন টনি লিউংয়ের দারুণ লুক এবং টনি লিউংকে নিজের " পুরুষাঙ্গের " ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখার মত বিরল এক মূহুর্ত।
7.Mack the Knife (1995)
dir: Chi-Ngai Lee
এই সিনেমায় টনি লিউং একজন নিবেদিত চিকিৎসকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। হংকংয়ের এক ঘিঞ্জি এলাকায় সে রোগীদের নিরলস সেবা দিয়ে যান। তবে তার চিকিৎসা করার পদ্ধতি প্রথাগত চিকিৎসার পদ্ধতি থেকে আলাদা। সে রোগীদের শরীরের পাশাপাশি মানসিক অবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দেন।
আমার মনে আছে, এই সিনেমা আমি ২০১৬ সালে দেখেছিলাম। তখন আমি টনি লিউংয়ের ফ্যান হয়েছি এক বছরের মত হবে। তবে তখনো তাঁর খুব বেশি সিনেমা দেখা হয়নি। দেখার মত অসংখ্যা সিনেমা পড়ে ছিল, তবে সেগুলোর মধ্যে আমার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল এই সিনেমা নিয়ে। কারণ এটাতে টনি লিউংয়ের লুক দেখে আমি ফিদা হয়ে গেছিলাম। অবশ্য খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে টনি লিউংকে দেখলে যে কেউই ফিদা হয়ে যাবে।
এই সিনেমায় টনি লিউংয়ের সাথে অভিনয় করেছেন আরেক ভেটেরান লাউ চিং-ওয়ান। তাছাড়াও আরো ছিলেন গিগি লাই, ক্রিস্টি চাং এবং অ্যান্ডি হাই।
6.A Chinese Ghost Story III (1991)
dir: Ching Siu-tung
হংকংয়ের বিখ্যাত রোম্যান্টিক-হরর A Chinese Ghost Story ট্রিলজির সর্বশেষ পার্ট। প্রথম দুটি গল্প-সংযোজিত হলেও এটাতে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্টোরিলাইন অনুসরণ করা হয়েছে। এটা অনেকটা প্রথম পার্টের রি-টেলিং ছিল। প্রথম এবং দ্বিতীয় পার্টে লেজলি চিউং-জো ওয়াংয়ের কেমিস্ট্রি সকলের মনে দাগ কেটেছিল। বিশেষ করে প্রথম পার্টে তাদের রসায়ন হংকং সিনেমা ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন অনেকেই। বিধায় যখন জানতে পারলাম যে লেজলি চিউং তৃতীয় পার্টে নেই, তখন অনেক রাগ উঠেছিল কিন্তু মুহূর্তেই যখন দেখলাম তাঁর জায়গায় অভিনয় করেছেন টনি লিউং চিউ-ওয়াই তখন নিমিষেই রাগ শেষ।
প্রথমটা আর এটার স্টোরিলাইন প্রায় সেম। প্রথমটায় লেজলি চিউং ঋণ সংগ্রাহকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আর এটাতে টনি লিউং সন্নাসীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
এটা প্রথমটার পর্যায়ের ছিল না কিন্তু যথেষ্ট ডিসেন্ট ছিল তা অস্বীকার করা অসম্ভব। এই পার্টে জো ওয়াং আরো বেশি লাস্যময়ী ছিলেন। যদি আমার মত জো ওয়াং ফ্যানবয় হন, তবে এটাকে " গ্রেট ফ্যান-সার্ভিস " ধরে নিতে পারেন। অবশ্য এই শব্দটি শুনলেই মাথায় আসে অপ্রয়োজনীয় জাতীয় কিছু যা এই সিনেমা আদতেও নয়। যথেষ্ট মানসম্পন্ন হরর-কমেডি সিনেমা এটা। এটা চাইলে স্ট্যান্ডঅ্যালোন হিসেবে দেখতে পারেন তবে আমি পুরো ট্রিলজি ক্রমানুসারে দেখার রেকমেন্ডেশন দিবো।
5.He Ain't Heavy, He's My Father (1993)
dir: Peter Chan
টনি লিউংয়ের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কমেডি ফিল্ম। সিনেমার গল্প বেশ কমন, আমি এই গল্পে বেশ কয়েকটি সিনেমা দেখেছি তবে আমার কাছে কমন গল্প কোন ইস্যু নয় যদি সিনেমা ভালোভাবে বানানো হয়।
এই সিনেমায় দেখানো হয় যে টনি লিউংয়ের সাথে তাঁর বয়স্ক বাবার সম্পর্ক ভালো নয়। তাদের মধ্যে বনাবনি হয়না। একদিন অলৌকিকভাবে টনি লিউং অতীতে চলে যায় যখন তাঁর বাবা যুবক ছিল এবং সেখানে সে তাঁর বাবার ভিন্নরকম এক রূপ দেখতে পায়।
সিনেমায় টনি লিউংয়ের বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরেক টনি লিউং (টনি লিউং কা-ফাই) এবং তাঁর মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন টনি লিউংয়ের তাৎকালিক প্রেমিকা এবং বর্তমান স্ত্রী কারিনা লাউ।
যেমনটা বলছিলাম, গল্পটা বেশ কমন কিন্তু এধরনের গল্প ঠিকভাবে বানালে তা বেশ মজাদার হয়, যার প্রমাণ এই সিনেমায়ও দেখা গেছে।
4.The Eagle Shooting Heroes (1993)
dir: Jeffrey Lau
আমার দেখা হংকং সিনেমার সবচেয়ে অদ্ভুত কাজগুলোর একটি এই সিনেমা। ওং কার-ওয়াইর Ashes of Time (1994) সিনেমার বাজেট অতিক্রম হয়ে যায়। তখন Ashes of Time এর বাজেট কাভার করার জন্য মাত্র ২৭ দিনে এই মো লেই তাউ সিনেমা বানানো হয়। চীনা নববর্ষে মুক্তি দেয়ার জন্য। সেসময় হংকং সিনেমায় শর্টকাট টাকা আয় করার এক মাধ্যম ছিল চীনা নববর্ষ। (মো লেই তাউ সিনেমা আসলে কী, তা কিছুক্ষণ পর ব্যাখা করছি)।
এই সিনেমা স্বল্প বাজেটে তৈরি এক মো লেই তাউ কমেডি হলেও এটাকে হংকং সিনেমা ফ্যানদের দেয়া ওং কার-ওয়াইর সবচেয়ে বড় উপহার বলা যেতে পারে৷
লেজলি চিউং, টনি লিউং চিউ-ওয়াই, জ্যাকি চিউং, ম্যাগি চিউং, জো ওয়াং, টনি লিউং কা-ফাই, কেনি বি, ব্রিজিটি লিন, কারিনা লাউ এবং ভেরোনিকা ইপের মত সব পরিচিত এবং এ-লিস্টার শিল্পীরা এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন। খুব কম সিনেমাতেই এমন অল স্টার-প্যাকড কাস্ট পাওয়া যায়। তবে এরকম অল স্টার-প্যাকড কাস্ট দিয়ে আমরা কী পেলাম? আমরা পেলাম মো লেই তাউ ফিল্ম যা এটাকে হংকং ফ্যানদের জন্য আরো মূল্যবান করে তোলেছে।
3.Chinese Odyssey 2002 (2002)
dir: Jeffrey Lau
এর আগের সিনেমাটা ছিল জেফ্রে লাউ পরিচালিত এক মো লেই তাউ সিনেমা। এটাও জেফ্রে লাউ পরিচালিত মো লেই তাউ সিনেমা।
মো লেই তাউর আক্ষরিক কোন অর্থ বের করা প্রায় অসম্ভব। এটাকে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে দেখা যেতে পারে। তবে আক্ষরিক অর্থ বাদ দিয়ে এটার অর্থ দেখতে চাইলে, তা মূলত দাঁড়ায় " ননসেন্স "। অর্থাৎ মো লেই তাউ কমেডি মানে হচ্ছে সহজ ভাষায় ননসেন্স কমেডি। একটি মো লেই তাউ ফিল্ম অবশ্যই একটি ননসেন্স ফিল্ম হবে, তবে একটি ননসেন্স ফিল্ম যে মো লেই তাউ হবে, এমন কোন কথা নেই। তবে একদম সহজভাবে দেখতে চাইলে, এটাকে ননসেন্স টার্ম হিসেবেই ধরে নেয়া যায়। মো লেই তাউ সিনেমাকে পুরো বিশ্বে জনপ্রিয় করেছেন স্টিফেন চাও। তাঁর পরিচালিত-অভিনীত Shaolin Soccer ও মো লেই তাউ ফিল্ম।
জেফ্রে লাউ পরিচালিত এই মো লেই তাউ সিনেমায় টনি লিউংয়ের সাথে অভিনয় করেছেন ফেই ওয়াং, ঝাও ওয়েই এবং চ্যাং চেন। Chungking Express (1994) এর সেই ফেই ওয়াং তাঁর ক্যারিয়ারে মাত্র ৬ টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন, এটা সেই ৬ সিনেমার একটি। ঝাও ওয়েইকে অনেকেই চিনবেন, Shaolin Soccer (2001) সিনেমার ক্লাইম্যাক্সে সে " হিরো এন্ট্রি " দিয়েছিলেন গোলরক্ষকের ভূমিকায় আর চ্যাং চেন পূর্বে Happy Together (1997) সিনেমায় টনি লিউংয়ের সাথে কাজ করেছিলেন।
উপরে উল্লেখিত The Eagle Shooting Heroes এর মত এটাও অল্প বাজেটে তৈরি হয়েছে চীনা নববর্ষে মুক্তি দিয়ে তুলনামূলক সহজে টাকা আয় করার জন্য।
2.Tokyo Raiders (2000)
dir: Jingle Ma
২০০০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত টনি লিউং অভিনীত In the Mood for Love এর নাম শুনেনি, এমন সিনেফাইল পাওয়া দুষ্কর। তবে In the Mood for Love এর পাশাপাশি সে'বছর টনি লিউং অভিনীত আরেকটি সিনেমা এসেছিল, যার বক্স-অফিস পারফরম্যান্স প্রত্যাশানুযায়ী In the Mood for Love থেকে বেটার ছিল৷ সেই সিনেমাই হচ্ছে Tokyo Raiders।
এই সিনেমায় টনি লিউং একজন ডিটেক্টিভের ভূমিকায় কাজ করেছেন। তাঁর সাথে সিনেমায় ছিলেন একিন চ্যাং এবং কেলি চেন।
এই সিনেমার ডিটেক্টিভের রোল টনি লিউংয়ের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে চার্মিং রোলগুলোর একটি। সিনেমায় তেমন কোন স্ট্যান্ডআউট কমেডি সিন নেই যা দেখে হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খাবেন, তবে সিনেমার পরিবেশ বেশ মজাদার ছিল। প্রতি মুহূর্ত উপভোগ্য ছিল। সিনেমায় একিন চ্যাংয়ের চরিত্র বেশ কিছু দারুণ অ্যাক্রোব্যাটিক অ্যাকশন করেছেন, যেগুলো দেখে আমার বেশ ভালো লেগেছে। আপনারা দেখলেও হতাশ হবেন না। এই সিনেমার সফলতার কারণে ২০০৫ সালে এটির সিকুয়েল বের করা হয় যা আমি এই তালিকায় ৯ম স্থানে রেখেছি এবং ২০১৮ সালে এটার ট্রিলজির তৃতীয় পার্ট Europe Raiders আসে, যা এতোটাই বাজে ছিল যে আমি তা শেষও করতে পারিনি। Europe Raiders পার্টে টনি লিউংয়ের সাথে ত্রয়ী বেঁধেছিলেন বিখ্যাত কে-পপ তারকা ক্রিস ইউ এবং তিফানি ত্যাং।
1.The Days of Being Dumb (1992)
dir: Blackie Ko
অবশেষে তালিকার ১নং সিনেমা। হ্যাঁ, নাম দেখে যা ভাবছেন, তা-ই। এটার নাম ওং কার-ওয়াইর Days of Being Wild এর প্যারডি। Days of Being Wild সিনেমায় " জেব " চরিত্রে অভিনয় করা জ্যাকি চিউংয়ের সাথে এই সিনেমার মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছেন টনি লিউং। তাদের সাথে ছিলেন আনিতা উয়েন। এটা তাঁর ডেব্যু ফিল্ম।
এই সিনেমাকে অ্যান্টি-ট্রায়াড, বাডি-কমেডি ফিল্ম বলা যেতে পারে। সিনেমায় দেখানো হয় যে টনি লিউং এবং জ্যাকি চিউং যেকোনো মূল্যে ট্রায়াডে যোগ দিবে কিন্তু যখনই তাঁরা যোগ দেয়ার কাছে চলে যায়, তখনই কোন না কোন ঝামেলা বেঁধে যায়। ট্রায়াড মানে হচ্ছে হংকংয়ের একপ্রকারের গ্যাংস্টার৷
বাডি-কমেডি সিনেমা পছন্দ করেন না, এমন মানুষ খুব কমই আছেন। বাডি-কমেডির ক্ষেত্রে গল্পের চেয়ে প্রধান চরিত্রের যুগলবন্দী বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সিনেমায় দুই নিখাঁদ অভিনেতা টনি লিউং এবং জ্যাকি চিউংয়ের যুগলবন্দী বাডি-কমেডি সিনেমা বিবেচনায় ছিল অসম্ভব দারুণ। পুরো সিনেমা হাসি পাওয়ার মত মুহূর্তে ভরপুর।
শেষে একদম ছোট করে বলবো, যেহেতু আমি এটাকে তালিকার ১য়ে রেখেছি, তাহলে নিশ্চয়ই এটার মধ্যে কিছু না কিছু আছে। তবে খুব বেশি প্রত্যাশার চাপ নিয়ে দেখবেন না। একটি সাধারণ কমেডি সিনেমার পক্ষে যতটুকু মজার হওয়া সম্ভব, এটা ততটুকু মজার ছিল।
.jpg)








